রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ০২:৩৫ অপরাহ্ন

মধু ও বিষের কৌটা: সাবধান হে জাতি

মধু ও বিষের কৌটা: সাবধান হে জাতি

আমাদের সময় ছাত্র নেতারা ছিলেন আদর্শ। তাদের কথায় কাজ হতো। বঙ্গবন্ধুও তাঁর ছাত্র নেতাদের কথা শুনতেন। শুনতেন বলেই অনেক সাহসী ভূমিকা নিতে পারতেন অনায়াসে। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের ছাত্র নেতাদের চরিত্র পবিত্র থাকেনি। আজ যদি পেছন ফিরে তাকাই বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নামে বিপ্লবের নামে যে সংগঠন তার হাত ধরেই নেমে এসেছিল নানাবিধ দুর্যোগ। একটা কথা বলে রাখি, যারা জানেন তারা ভুল, তারা সমালোচনা কিংবা বিরোধিতা মানতে পারেন না। জাসদ নিয়ে কিছু বললেই পুরনো মানুষজন, বিশেষত আমার বয়সী মানুষদের গায়ে ফোস্কা পড়ে। একটি ব্যর্থ বিপ্লবের খসড়া ও পরিশেষে আ স ম রব কিংবা ইনুর মত নেতাদের জন্ম দেয়া জাসদ এখনো মনে করে তারা সঠিক ছিলো। এই দুইজনের নাম বললাম এই কারণে রবকে মন্ত্রী বানালেই সরকার ভালো। আর নয়তো, তার ভাষায়, আওয়ামী মানে আপদ। এই আপদের ঘরেই জন্ম তাঁর। আর ইনু এখন মন্ত্রী। ইনু সাহেব বিপ্লব বা আন্দোলন ঘরে রেখে ধর্ম মেনে এখন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বলাটাকেই মানছেন আসল কাজ। এতে তিনি যে সরকারে আছেন বা যে দলের কারণে মন্ত্রীত্ব করছেন তাদের ইমেজের কি হয় কিংবা জনমনে কি প্রভাব পড়ে তা নিয়ে থোড়াই চিন্তা তাঁর। আবার দেখুন যে বাম দলকে মনে প্রাণে সমর্থন করতাম যাঁর নেতা ছিলেন মনি সিংহ বা ফরহাদ তাঁদের একদা দুঁদে নেতা মতিয়া চৌধুরী কিংবা নাহিদের কান্ড কারখানা। মতিয়া আপার বয়স বেড়েছে। তাঁর ভাষণ যেটি নিয়ে আমাদের রাজনীতি বহুকাল পর রাজাকার জায়েজ করার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছিল–সেটি আসলে কেমন?

আমি শুনে দেখেছি আসলে তেমন কিছু বলেননি, তবে বলেছেনও। কি বলেছেন? ঐ যে শীতকালের ওয়াজ গ্রীষ্মকালে করা। তেমন কিছু। এতে লাভ হয়না। বরং হিতে বিপরীত হয়। সেই বিপরীত দিকটি বোঝার মত শক্তি হয়তো তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। অভিজ্ঞতা এক বিষয় আর তাকে ঝালানো বা শান দেয়া আরেক বিষয়। সেটি তাঁরা করেন না। নাহিদ সাহেবকে দেখুন। তিনি আসলে সরকারী লেখাপড়ার মতই সরলরেখায় চলা বিনামূল্যে পাওয়া পাঠ্য বইয়ের মত ম্যাড়ম্যাড়ে টাইপের। সামান্য নকল বা প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে না-পারা হাঁসফাঁস করা এই একদা বাম নেতা কি বোঝেন না যে এক বয়সে মানুষকে বিশ্রামও নিতে হয়?

কথাগুলো বলার মূল কারণ আমাদের বর্তমান নেতৃত্বের সংকট। কিছুদিন আগে জেলখানা থেকে বেরিয়ে আসা মাহমুদুর রহমান মান্না আগে কলাম লিখতেন। তারও আগে জ্বালাময়ী ভাষণ দিতেন। তিনিও বাম। তবে বাসদের নেতা। তখন বাসদ মানে স্ফুলিঙ্গ। বাসদ মানে তারুণ্য। সে সুবাদে ডাকসুতে জেতা এই নেতাকে একবার কষে ধমক দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সিপাহসালার কর্ণেল ওসমানী। আমরা তখন যুবক। দেশে সামরিক শাসন। সামরিক নেতা নিজেকে বৈধ করার জন্য নির্বাচনের ব্যবস্থা নিয়েছেন। সংসদ নয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। সে নির্বাচনে জোটের প্রার্থী ওসমানী সাহেব। সাদা পাঞ্জাবী আর পায়জামায় ছোটখাটো দেখতে ভারী গোঁফের মানুষ। তবে তেজ বেশী। সন্ধ্যায় লালদীঘির ময়দানে চট্টগ্রাম ভেঙে পড়েছে। মানুষের মনে বঙ্গবন্ধু ও চার নেতাকে হারানোর বেদনা আর পাকিস্তানের প্রেতাত্মা ফিরে আসার ভয়। জামাতকে দোষ দিয়ে কোন লাভ নেই। তারা তখনো আড়ালে। গুটি চালছিলো একদা মুক্তিযুদ্ধে জড়িত হওয়া মেজর জিয়াউর রহমানের দল। সাথে চৈনিক নামে পরিচিত বামেরা। সে দুঃসহ জায়গা অতিক্রম করার চেষ্টা চলছে তখন। মান্না যখন ভাষণ দিতে উঠলেন তখন বেলা গড়িয়ে। একাধিক বিশেষণ আর অপরিমিত কথা সহ্য করতে পারেননি সিপাহসালার। এক ধমকে থামিয়ে মাইক হাতে নিয়ে তাঁর কথা বলেছিলেন সেদিন। এখন মনে হয় তিনি হয়তো বুঝতে পারছিলেন বাগাড়ম্বর আর আন্তরিকতা এক নয়। প্রসঙ্গটা মনে এলো এই কারণে যে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কোটা আন্দোলন ও তার ধারাবাহিকতায় দেশ যখন আরেকটি ক্রান্তিকাল কিংবা খারাপ সময় পার করলো মান্না সাহেব তাঁর ফেইসবুকে একটি ষ্ট্যাটাস দিয়ে লিখেছেন, প্রধানমন্ত্রী রাগ করে বললেও কোটা বাতিল এখনো আদেশে পরিণত হয়নি। তিনি এর আশু ব্যবস্থা নেয়া এবং নিশ্চিত করার কথা লিখেছেন খোলাখুলি।

আর একটা ঘটনা বলি। সাংবাদিক জাফর ওয়াজেদ একদা ডাকসু নির্বাচনে জিতেছিলেন। কবি ও স্বাধীনচেতা মানুষ তিনি। তাঁর বর্ণনায় আছে জেনারেল জিয়াউর রহমান যখন ছাত্রনেতাদের ডেকে নিয়ে গেছিলেন, তাঁরা কজন বঙ্গবন্ধুর ব্যাজ পরেই গিয়েছিলেন সেখানে। এবং কথা প্রসঙ্গে তারা রাজনীতি অবমুক্ত করা ও ছাত্রদের কথা বলার সুযোগ দেয়ার কথা বলায় খানিকটা বিচলিত হবে পড়েন জিয়া। পরে মান্নাকে নাকি তিনি একপাশে ডেকে নিভৃতে কিছু বলেন। এর পর জানা যায় অসংখ্য রিকশার লাইসেন্স আর দোকানের মালিক হয়ে তাঁর একটা হিল্লে হয়ে যায়। সেটা হোক বা না হোক ঘটনাক্রমে আমরা দেখছি মান্না যিনি কিনা আওয়ামী লীগের মত বড় দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন সে জায়গাটা কাজে না লাগিয়ে ঠিকই নিজের দূর্গে ফিরে গেছেন। যেমনটা আমরা ড: কামাল হোসেন কিংবা কাদের সিদ্দিকীর বেলায়ও দেখি। বাংলাদেশে অজস্র মেধাবী কূটনীতিক আর প্রবীণ মানুষ থাকার পরও বঙ্গবন্ধু ড: কামালকে পররাষ্ট্র মন্ত্রী করেছিলেন। সে মর্যাদা বা আনুগত্য তিনি ধরে রাখেননি। রাখতে হবে এমন কোন কথা নাই। কিন্তু তার মানে এই না যে তিনি একশ আশি ডিগ্রী ঘুরে যাবেন। কাদের সিদ্দিকীর কথা না বলাই ভালো। বহু নাটকের জন্ম দেয়া সুযোগ পেলে শেখ হাসিনাকে ভগ্নি ডাকা এই মানুষটি কি চান তিনি ছাড়া আর কেউ বলতে পারবে না। যে ঘরে যে দূর্গে এখন আশ্রয় নিচ্ছেন সেটি তাঁর দুশমনের স্বর্গ। কারন তিনিই সে লোক যিনি স্বাধীনতার পর বিজয়ের মুহূর্তে বেয়নেটের খোঁচায় রাজাকার নিধন করেছিলেন। তাঁর কারণে বিদেশী মিডিয়ার তোপের মুখে পড়া নবজাতক দেশের ইমেজ বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়েছিল তাজউদ্দিন বা অন্যান্যদের। তিনি পঁচাত্তরে আরো একবার ভারতে চলে যান। প্রতিজ্ঞা করেন বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার নাহলে গোশত খাবেন না। আবার ঘটা করে অনুষ্ঠান করে মাংস ভোজনও করেন একসময়।

নেতাদের এই দোলাচল আসলে কি বার্তা দেয় আমাদের? কিভাবে গড়ে উঠবে নেতৃত্ব? এখন যারা সরকারী দলের নেতা তারা জয় বাংলা আর জয় বঙ্গবন্ধু বলেই খালাস। তাদের ধারণা এই আনুগত্য থাকলেই ব্যবসা বানিজ্য বা আয় রোজগার বাড়ানো যায়। আদর্শ বা ইতিহাস মূলত কথার কথা। বি এন পি এখনো তৃণমূলে শক্তিশালী । কিন্তু তাদের ছাত্রদল আজ মৃত। সে মৃত্যুর কারণ যে আদর্শহীনতা সেটাও তারা বোঝেন না। বিদেশে বসে দেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করা কি এত সহজ? তারা মূলত ভুগছেন নেতার সংকটে। সাথে আছে ইতিহাসের সাথে মিথ্যাচার। ফলে যখন সুযোগ মিলছে তখনই তারা নাশকতা বা বেপরোয়া কিছুর সাথে যোগ হয়ে উস্কে দিয়ে ফায়দা নিতে চাইছে। এতেও কাজ হবে না।

নেতৃত্বের এই চরম সংকটকালে আমাদের সামনে যে বাস্তবতা তাতে একটা বিষয় পরিষ্কার: সামনে যদি এধারা চলতে থাকে নারী পুরুষ কেউই নিরাপদ থাকবেনা। ঢাকায় যে মেয়েটিকে প্রায় বিবস্ত্র করে গলায় জুতার মালা পরিয়ে ঘোরানো হলো তাতে তার আত্মহত্যা করাটাও বিচিত্র কিছু ছিলোনা। আমি তার হয়ে কথা বলছি না। কিন্তু ভাবতে বলছি আইন ও শৃঙ্খলার প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধাও লুপ্ত হতে চলেছে। মধ্যবিত্তকে দেখুন, তাদের মনে এক মুখে আরেক। এদের মতো হাসিনা বিরোধিতা কোথাও নাই। মুখে দুর্নীতি, ব্যাংকলুট কিংবা ধর্ষনের বিরোধিতার কথা বললেও আসলে তারা একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তির পর শেখ হাসিনার প্রতি নির্মম। সমঝোতার রাজনীতি এদেশে কি তবে অসম্ভব? অসম্ভব শান্তিতে বসবাস? হিন্দু মুসলমান, আদিবাসী বাঙালি শিয়া সুন্নীর পর আসবে নোয়াখালী কুমিল্লার মত বিরোধ। যে তারুণ্য বিশ্বায়নের ফলে দুনিয়া দেখে, একমিনিটে যার হাতে চলন্ত মিডিয়া, যার চোখে নাগরিক অনাগরিক সভ্যতা মুহূর্তে দৃশ্যমান সে কেন আজ এমন উগ্র? কি সেই কারণ যা তাকে এই মাটি মানুষ ও স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ‘আমি রাজাকার’ লিখিয়ে মাঠে নামতে প্ররোচনা দেয়?

বহুবছর পর আমরা যখন থাকবো না, যখন এদেশে মুক্তিযুদ্ধ চোখে দেখার মানুষেরা বেঁচে থাকবেন না তখন কি তবে একথাই রটবে যে আসলে আমরাই ছিলাম রাজাকার আর দুশমনেরা ছিলো দেশপ্রেমী? শেখ হাসিনার বলিষ্ঠতা দেশপ্রেম নেতৃত্ব সব মেনে নিয়ে ব

লি নতুন নেতৃত্ব নতুন রক্ত আর নবীন প্রেম এখন জরুরী। তিনি থাকতেই তা হতে হবে। কোটা আন্দোলনের সাফল্য ব্যর্থতার ভেতরে একটা ম্যাসেজ আছে। যে কৌটায় বিষ তাকে চিরতরে নির্মূল করা আর যেটায় মধু তাকে মানুষের কাছে সহজ

লভ্য করা। এই কাজ রাজনীতির। তারা যদি তা করতে না পারে তবে সংস্কৃতি ও সমাজকেই দায় নিতে হয়। সে জায়গাটাও আজ নড়বড়ে। তবু আশায় বুক বাঁধি। একদিন আবারো হয়তো সময়ই জাগিয়ে তুলবে নতুন কোন শাহবাগ। নতুন কোন রেসকোর্স। নতুন কোন বিজয়ে। বাংলাদেশ পরাজিত হয় না হবার জন্য জন্মায়নি। সেটাই যেন সত্য হয়।

 

অজয় দাশগুপ্ত

দয়া করে সংবাদটি শেয়ার করুন

© ২০১8 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত জন সংবাদ | কারিগরি সহযোগিতায় ক্লাইম্যাক্স আইটি নেট |
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি